সাহিত্যের সিংহাসনে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কুর্ণিশ, কুর্ণিশ

siraji
ছবি: ইন্টারনেট

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। কে তিনি? কবি। কোন জায়গার? কেন! বাংলাদেশের। সত্যি কি তাই? নাহ। একেবারেই তা নয়। ঢাকায় তিনি সিরাজী ভাই। কলকাতার সিরাজীদা। সুনীল শিবিরের অতি ঘনিষ্ঠ এই কবি শিবাশিস মুখোপাধ্যায়ের সিরাজী’দা, পিনাকী ঠাকুরের সিরাজী’দা, শ্রীজাতর সিরাজী’দা, সারা কলকাতার কবিদের সিরাজী’দা। নাহ, শুধু কবি সুবোধ সরকারের সিরাজী। তিনি কলকাতায় এলে মেলা বসে তাকে নিয়ে।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আমার মেন্টর। আলোকবর্তিকা যদি সুনীল’দা হন তাহলে হাতে ধরে রাস্তা পার করেছেন সিরাজী’দা। কী ভাবে? সিরাজীদার সাথে এক কলকাতায় এক বিশেষ আসরে আলাপ হয়েছিল। সে আসরে সুনীল বা কৃত্তিবাস শিবিরের গুরুসহ সবাই উপস্থিত। কবিতা পাঠ শুরু হতেই আমার অসম্ভব পছন্দ হয়ে গেল তার কবিতা। ডাই হার্ড ফ্যান হয়ে গেলাম তার লেখার। সেবারে তার আনা কাব্যসংকলনের এক একটি কপি প্রায় ছিনতাই করে নিয়ে এলাম। পড়ছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। সুনীল’দা চলে গেলেন ২০১২ সালে। সিরাজীদা ২০১৩ তে এলেন কলকাতা বইমেলায়। তার আগে আমার প্রথম কবিতা সংকলন ‘রূপসারি’ প্রকাশ হয়েছে এবং তা পৌঁছে গিয়েছে ঢাকায় সিরাজীদার হাতে। সিরাজীদা এসেই বললেন ‘তোমার রূপসারি পড়লাম। ভাল লেগেছে। তবে…’ । এই ‘তবে’ বর্ণনা করার আগে সিরাজীদা আমার হাতে তার বই ‘পশ্চিমের গুপ্তচর’ তুলে দিলেন। পৃষ্ঠা উলটে দেখি তাতে লেখা – অমিত গোস্বামী, যেজন কবিতায় অন্ধকারকেও দিবস করে, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ৯/০২/২০১৩। তার ‘তবে’ অর্থাৎ দিকনির্দেশিকা শুনলাম। শুনে বললাম, সিরাজীদা একটা ঘোরতর অন্যায় হয়ে গেছে। কী অন্যায়? দাদা, এই কবিতা সংকলনে ‘সংশয়’ কবিতাটায় আপনার লেখা কবিতার দেড় লাইন ‘সূর্যকিরনে অভিমানে মাছরাঙা/ গাছে বসেছিল…’ এটুকু অজান্তে নিয়ে ফেলেছি। তাতে কী? এটা হতেই পারে। এটা প্রভাব। তবে আমারটা অন্ত্যোমিলহীন, তোমারটা ছন্দে লেখা। না না সিরাজীদা, আমার এত খারাপ লাগছে…। দূর পাগল, পরে পুণর্মুদ্রণ হলে ঋণস্বীকার লিখে দিও। কিন্তু সিরাজী’দা, এত ঋণ শুধব কি করে?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। বাংলাদেশের জাতীয় কবিতা পরিষদের সম্পাদক। ২০১৪ সাল। হঠাৎ ই-মেইলে তার আমন্ত্রণ। জাতীয় কবিতা উৎসবে কবিতা পড়ার। আমি নেহাত এলেবেলে। আমাকে এই সম্মান? সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা আরও অনেক মহানক্ষত্রদের সাথে এক মঞ্চে কবিতা পড়ার ডাক। আপ্লুত আমি এসেই দেখা করলাম সিরাজীদার সাথে। পরিবারের খুব প্রিয় এক সদস্যের অসুস্থতায় পাগলপারা সিরাজীদা একটাই কথা বললেন – আমি থাকতে পারব না। কিন্তু তুমি এমন কবিতা পড়বে যাতে সকলে বলেন যে আমি যথার্থ কবিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ইউ টিউবে আপ লোড করা সেই কবিতাপাঠ আজও গুরুর শিষ্যের থেকে সেরা পারফরম্যান্স বার করে আনার অন্যতম স্বাক্ষর হিসেবে বেঁচে আছে।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। হাজির আছেন ২০১৪’র ৮ মে’র দুপুরে। রাইটার্স ক্লাবে। উপলক্ষ কবি রাজু আলাউদ্দিনের জন্মদিন পালন, আমাকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন, কবিতা পাঠ ও আলোচনা। মুহাম্মদ নুরুল হুদা আয়োজক। প্রায় সকল নামী কবি হাজির। এ ধরনের অনুষ্ঠান যে ভাবে এগোয় সেভাবে চলছিল। আমার কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন মুহাম্মদ নুরুল হুদা, রাজু আলাউদ্দিন ও মানিক মহম্মদ রাজ্জাক। এবারে উঠলেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী। বললেন, অমিত, তোমার কবিতা লেখার ক্ষমতার বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তুমি বাংলাদেশে বাংলাদেশের কবিতা লিখতে চাইছ। এটা সহজ নয়। গঙ্গার পলির স্বাদ মিষ্টি। ওখানে কোন সংগ্রামের ইতিহাস নেই। কিন্তু পদ্মার পলি নোনতা। এখানে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত মিশে আছে, ২ লক্ষ মা’বোনের সম্ভ্রম। এ মাটিকে জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে জানতে হবে। এর যন্ত্রণা প্রাপ্তি তোমাকে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। এদেশকে তোমায় হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তবেই তুমি এদেশে এদেশ নিয়ে লিখতে পারবে। এ কাজ খুব কঠিন। ওপারে বসে হয় না। উপস্থিত সকলে একটু ব্যোমকে গেলেন। বেশ কড়া কথা বলে ফেলেছেন সিরাজীদা। আমি বললাম, আপনার এই কথাগুলি আমাকে নতুন পথের সন্ধান দিল। আমি আপনার উপদেশ অনুযায়ী চলে প্রমাণ করব আমি বাংলাদেশের লেখক।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ৩১ জানুয়ারি, ২০১৫। হাজির আছেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আমার ‘যখন বৃষ্টি নামল’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সিরাজীদার হাতে মোড়ক উন্মোচন হল আমার প্রথম উপন্যাসের। উন্মোচন করেই বইটা সোজা ঢুকিয়ে দিলেন ঝোলায়। বললেন, পড়ে বলব, গদ্যের হাত কেমন। তারপরে ক্রমাগত দেখা, আড্ডা, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপচারিতা ক্রমশই আমার সামনে উন্মোচিত করল এক প্রকৃত কবির মুখ। আমি আমার ভাবনা প্রকাশ করলাম। আমি লিখলাম বর্তমানকালের কবিদের মধ্যে কলকাতায় সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ও কামাল চৌধুরী। তাতে কিছুদিন আগে আকাদেমি পুরস্কার পাওয়া এক কবির কি ভীষণ উষ্মা। আমাকে ‘ল্যাদা কবি’ বলে ফেসবুকে পোস্ট দিলেন। সিরাজীদাকে কথা প্রসঙ্গে বললাম। হাসতে হাসতে বললেন, তবু তো তোমাকে ‘কবি’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ল্যাদাই বলুক আর আধাই বলুক।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আজ বাংলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক। এই প্রথম একজন পেশায় প্রকৌশলী কবি সম্ভবত এই পদে বসলেন। আমি নিয়োগকর্তা বর্তমান সরকারকে শতসহস্র কুর্ণিশ জানাব এই কারণে যে এই পদে অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ছাড়াও আরও কেউ বসার যোগ্যতা রাখেন সে কথাটার স্বীকৃতি দেওয়া। সিরাজীদার নেতৃত্বের তুলনা নেই। কোথায় কী করতে হবে, কোথায় কী বলতে হবে – সেটা সিরাজীদা খুব ভাল জানেন। বাংলা অ্যাকাডেমির এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা ও উন্নাসিকতা আছে যা ভাল সাহিত্যের প্রতিবন্ধক যেমন বেশ কিছু স্বীকৃতির জন্যে বাংলাদেশি হতেই হবে। তাদের পত্রিকায় এপারের কেউ লিখতে পারবেন না। ভারতে এই গন্ডীবদ্ধতা নেই। সেকারণেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভারতের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ খেতাবের অধিকারী। কাঁটাতারের এ বেড়া সিরাজীদা একদিন ভাঙবেন আমি নিশ্চিত।

Share with your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *